মোঃ রফিকুল
ইসলাম,মহাদেবপুর,নওগাঁ,প্রতিনিধিঃ

আদিবাসী জনগোষ্ঠী আর পিছিয়ে পড়া নয়। তাদের পরিবার থেকে ছেলে মেয়েরা এখন স্কুল কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজে অধ্যায়নত। একসময় তারা বরেন্দ্র অঞ্চলের জঙ্গল, উচু-নিচু জমি কেটে আবাদ যোগ্য ক্ষেতের জমি করে তুলেছিল। এরপর বিভিন্ন আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক কারনে জমি হারিয়ে এ অঞ্চলের আদিবাসীরা ভূমিহীনে পরিনত হয়েছে। ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর থেকে এ পর্যন্ত ৯৫ভাগ আদিবাসী তাদের জমি হারিয়েছে। অবশিষ্ট যে ৫ ভাগ আদিবাসীদের নিজস্ব জমি আছে তারাও জমি হারানোর আতংকের মধ্যে দিন কাটিয়ে ছিল। এমনকি আদিবাসী গোরস্থানগুলো দখলদারের কবল থেকে রক্ষাও পায়নি। ১৯৫০ সালে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহন ও প্রজাতন্ত্র আইনে নিজ নিজ নামে জমি রেকর্ডের সুযোগ সৃষ্টি হলেও সাংস্কৃতিক কারনে আদিবাসীরা তা করেনি। কেননা আদিবাসীরা মনে করত জমি হল প্রাকৃতিক সম্পদ। এর উপর মানুষের কর্তৃত্ব থাকা উচিত নয়। এ চিন্তা চেতনা থেকে আদিবাসীরা তাদের নিজেদের নামে জমি রেকর্ড করে নিয়েছে। এখান থেকেই আদিবাসীদের ভুমি হারানো শুরু। ১৯৪৭ সালে দেশভাগ ও ১৯৭১সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন অন্যানের মত প্রায় অধিকাংশ আদিবাসীরাই বেঁচে থাকার আশায় ভারতে পাড়ি জমায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তারা বাড়ী ফিরে এসে আর জায়গা-জমি ফেরত পায়নি। তাদের জমি দখল করে নেওয়া হয়েছে। আদিাসীরা সংখ্যালঘু হওয়ার কারনে তারা কোন প্রতিবাদ করতে পারেনি। অনেকেই মনের দুঃখে আবার ভারতে পাড়ি জমিয়েছে। আবার অনেকেই নিজের জমিতে দিন মজুর হিসেবে তাদের জীবন নতুন করে শুরু করেছে। মুক্তিযুদ্ধের পর যে সব আদিবাসী আর ফিরে আসেনি তাদের জমি সমাজের প্রভাবশালীরা দখল করেছে এবং এক সময় তাদের নামে রেকর্ড নিয়েছে। ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহন ও প্রজাতন্ত্র আইনে ৯৭ ধারা অনুযায়ী আদিবাসী কর্তৃক আদিবাসীদের জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের অনুমোদন নেয়ার নীতিমালা থাকলেও আদিবাসীদের চিহিৃত করণ বিষয়ে সুনিদিষ্ট ঘোষনা না থাকায় তা কার্যকর হচ্ছে না। এ বিষয়টিই এখন প্রতারনার ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রায় ৪৫টি আদিবাসী স¤প্রদায় বাস করলেও ৯৭ ধারায় মাত্র ৮টি স¤প্রদায়ের কথা বলা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই উক্ত ৮টি স¤প্রদায় ছাড়া অবশিষ্ট স¤প্রদায় গুলোকে সরকারী কর্মকর্তারা আদিবাসী হিসেবে আমলে নিচ্ছে না। আবার যে সকল স¤প্রদায়ের নাম আইনে উল্লে¬¬¬খ আছে তাদের সস্পত্তি ক্রয়ের ক্ষেত্রে ও জেলা প্রশাসকের অনুমতির ঝামেলা এড়ানোর জন্য কৌশলের আশ্রয় নেয়া হচ্ছে। উরাও পদবীধারীদের সরদার উপাধি দিয়ে রেজিস্ট্রেশন কর্মকর্তার সামনে উপস্থাপন করা হচ্ছে। ফলে আদিবাসীদের জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রে অনুমতির ঝামেলা ক্রেতাদের পোহাতে হচ্ছে না। আদিবাসীরা যেহেতু বিভিন্ন কারনে তাদের জমি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে তা বুঝেই হোক আর না বুঝেই হোক এ বিষয়ে তারা কোন ভুমিকা রাখছে না।পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী আদিবাসী সম্পদায়ের জন্য গণমাধ্যম ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। উলে¬খযোগ্য দৈনিক বাংলাবাজার,দৈনিক আজকালের খবর, দৈনিক আমাদের রাজশাহী পত্রিকায় আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা এনায়েতপুর ইউনিয়নের ইটালী গ্রামের বরুন উরাও”র ও উত্তরগ্রাম ইউনিয়নের ধীরেন পাহানের জীবনচিত্র প্রকাশ হওয়ায় তাঁদের ভাতা নিশ্চিত হয় এবং নিয়মিত তারা ভাতা পাচ্ছেন। গণমাধ্যম কর্মিদের বলিষ্ট লেখনীর ফলে সমাজের এক শ্রেণীর সুযোগ সন্ধানী চতুর বাজদের হাত থেকে এই সম্পদায়েরা আশার আলো দেখতে শুরু করেছে। এ ছাড়া তারা মাদক সেবা থেকে বিরত থাকছে এবং বর্তমান সমাজের প্রতিটি স্তরে তাদের অবস্থান সক্রিয় রয়েছে। তাদের মধ্যে মেধার বিকাশসহ নেত্রিত্বের বহিপ্রকাশ ঘটছে। গণমাধ্যম এই পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে মডেল সমাজে তাদের অবস্থান ফিরিয়ে দিয়েছে যা অস্বিকার করার সুযোগ নেই। এ ছাড়া গণমাধ্যম সক্রিয় ভূমিকা রাখায় আদিবাসীরা নিজেদের অধিকার প্রতিষ্টার লক্ষ্যে আন্দোলন মূখি এবং তারা তাদের ন্যায্য অধিকার ও মানবাধীকার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই ১৯৭১সাল থেকেই ব্র্যাক আদিবাসী ও সমাজের হতদ্ররিদ মানুষের সেবায় নিয়োজিত থেকে কাজ করছে। এই সংস্থা মুক্তিযুদ্ধ চালাকালীন মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে ছিলেন এবং আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সকল সেবা দিয়েছিলেন। এছাড়া ব্র্যাকের মত এনজিও, বরেন্দ্র ভূমি সমাজ উন্নয়ন সংস্থা ও আদিবাসী উন্নয়ন কেন্দ্রের হাত বাড়ানোর ফলে বর্তমান সময়ে আদিবাসীরা তাদের ছেলে-মেয়েদের সূশিক্ষার জন্য স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজে অধ্যায়নরত রয়েছে। পরিশেষে, গণমাধ্যমের বলিষ্ট ভূমিকার ফলে আদিবাসীদের অনেক সমস্যা সমাধানে উন্নত হয়েছে এবং তারা উন্নত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সেই আদি যুগের কৃষ্টিকালচারকে ভুলে সভ্য সমাজের অগ্রসর হচ্ছে। বর্তমানে আদিবাসীদের পরিবার অনেক উন্নত হয়েছে। স্কুল, কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজে অসংখ্য আদিবাসী ছেলে-মেয়েরা অধ্যায়নরত রয়েছে। এখন আর আদিবাসীরা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী নয়। তাদের পাশে এবং সাথে সবাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *