বাগমারাপ্রতিনিধিঃ
রাজশাহীর বাগমারায় অবৈধভাবে ফসলি জমিতে যত্রতত্র পুকুর খনন অব্যাহত রয়েছে। এলাকা ভিত্তিক স্থানীয় প্রভাবশালীরা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা করে জমির প্রকৃতি পরিবর্তন করে এখনো চলছে পুকুর খননের হিড়িক। এতে কৃষি জমির প্রকৃতি পরিবর্তন করে পুকুর বা দিঘি খনন করায় আবাদি জমির পরিমান কমে যাচ্ছে এবং চাষাবাদ হুমকির মুখে পড়ছে। পুকুর খননে স্থানীয় প্রশাসনের নিস্কিতায় এলাকাবাসীর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নেই বিল, খাল, ও দাড়া দখল করে ফ্রি স্টাইলে যত্রতত্র পুকুর খনন করে মাছ চাষের নামে জমির প্রকৃতি পরিবর্তন অব্যাহত রেখেছেন। এছাড়াও ফসলি জমি, ভিটে বাগান, বসত ভিটা কেটে কোন নিয়মের তোয়াক্কা না করে প্রশাসন কে ম্যানেজ করে হরদমে চলছে পুকুর ও দিঘী খনন। এতে বিভিন্ন এলাকায় বর্ষা মৌসুমে পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে পড়ছে। পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় এলাকার শত শত বিঘা ফসলি জমি পড়ে থাকছে। হুমকির মুখে পড়েছে কৃষি আবাদ। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ রয়েছে জমির প্রকৃতি পরিবর্তন করা যাবে না। আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙুলি দেখিয়ে ফসলি জমিতে চলছে হরদম পুকুর খনন। গত কয়েক মাসে উপজেলার গোয়ালকান্দি, মাড়িয়া, বাসুপাড়া, শুভডাঙ্গা, আউচপাড়া, নরদাশ, ঝিকরা, গণিপুর, গোবিন্দপাড়া, যোগীপাড়াসহ প্রায় সবগুলো ইউনিয়ন এলাকায় প্রভাবশালীরা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ উপেক্ষা করে জমির প্রকৃতি পরিবর্তন করে পুকুর খনন করলেও যেন দেখার কেউ নাই। স্থানীয় প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা কতিপয় ব্যক্তিদের যোগ সাজসে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে পুকুর খনন কাজ এখনো চলছে বলে জানা যায়। ব্যবসার নামে ফসলি জমির প্রকৃতি পরিবর্তন করে পুকুর খনন করলেও কেউ এগিয়ে আসছে না বলে কৃষকরা দাবি করেছেন।
কৃষকদের অভিযোগ প্রভাবশালীদের হাত থেকে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ও ফসলি জমিতে নিয়ম বর্হিভূত অপরিকল্পিত পুকুর খনন বন্ধের জন্য দফায় দফায় ভুক্তভোগী একাধিকবার স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার, জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যবস্থা গ্রহণের লিখিত আবেদন করেও কোন সুফল মিলে না বলে তারা দাবি করেন। পুকুর খননকারীরা এলাকার প্রভাবশালী হওয়ার কারণে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হচ্ছে না বলে তারা দাবি করেন। সম্প্রতি নরদাশ ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য মোঃ রফিকুল ইসলাম,পুকুর খনন নাম করে অন্যর বাড়ির পাশ থেকে ভোকুমিশন দিয়ে মাটি কেটে সরকারি রাস্তা নষ্ট করে শতশত গাড়ি মাটি অন্যত্রে বিক্রয় করছে। একই ইউনিয়নের মুনজু নামে এক ভাটার মালিক একইভাবে মাটি বিক্রয় করছেন এবং নিজে ও মাটি তার ভাটায় নিচ্ছেন। গোয়ালকান্দি বিলে স্থানীয় প্রভাবশালী আজাদ রহমান ওরফে ভাটা আজাদ ১৮০ বিঘা জমি জবর দখলের মাধ্যমে পুকুর খননের কাজ করেন। এছাড়াও একই বিলে কাউসার ও দুলাল গং, এবাদুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী মহল প্রায় ৭০০ বিঘা আবাদি জমিতে অবৈধভাবে পুকুর খনন করেন। সম্প্রতি ওই এলাকায় ছোট বড় মিলে অন্তত ৫০টি পুকুর খনন করা হয়েছে। কয়েক মাসে উপজেলার শত শত একর কৃষি জমির প্রকৃতি পরিবর্তন হয়ে গেছে। অবৈধ পুকুর খনন বন্ধের জন্য গোলাকান্দি ইউপি’র ইউপি সদস্য আবেদ আলী স্থানীয় প্রশাসনের কাছে আবেদন করলেও কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় গ্রামবাসীরা। এলাকাবাসী জানান, বর্ষাকালে যশের বিলের চারিদিকে প্রায় ৩ থেকে ৪শ মৎস্যজীবী মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। পুকুর খননের কারনে বিল এলাকার প্রভাবশালী ও ধনাঢ্য ব্যক্তিরা কিছুটা লাভবান হলেও নি:স্ব হয়ে পথে বসতে চলেছে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা।
এখনও চলছে পুকুর খনন। উপজেলার মাড়িয়া ইউনিয়নের গাঙ্গোপাড়া বিলে ফসলি জমিতে পুরো এলাকা জুড়ে চলছে দিঘী খনন। ভবানীগঞ্জ বাজারের প্রভাবশালী আব্দুল গাফফার প্রশাসন কে ম্যানেজ করে ওই দিঘী খনন করছেন বলে জানা গেছে। গণিপুর ইউনিয়নের একডালা বিলেও প্রভাবশালী কয়েকজন পুকুর খনন করছেন। পুকুরখননকারীদের মধ্যে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকেই জানান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে কর্মরত একজন কে ম্যানেজ করে পুকুর ও দিঘী খনন করা হয়। উপজেলার যত পুকুর ও দিঘী খনন করা হয়েছে এবং হচ্ছে সবগুলোই তার মাধ্যমে দেন-দরবার করা হয়েছে বলে জানা যায়।
এদিকে কৃষি জমিতে পুকুর বা দিঘি খনন না করার আবেদন জানিয়ে উচ্চ আদালতে জনস্বার্থে জালাল উদ্দিন নামে এক সুপ্রীম কোটের আইনজীবি ৪৩৫৩/১৭ রিট পিটিশন করে। পরে আদালত এসব পুকুর খনন বন্ধের নিয়মিত ভ্রাম্যমান পরিচালনার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেন। উচ্চ আদালতের রায় উপেক্ষা করে পুকুর বা দিঘি খনন বন্ধের ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসন ব্যবস্থা না নেয়ায় অবৈধ পুকুর খনন অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের নিস্কিয়তা আদালত অবমাননার সামিল বলে আইনজীবি জালাল উদ্দিন (উজ্জ্বল) দাবি করেছেন।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার শরিফ আহম্মেদ বলেন, অবৈধ পুকুর খনন বন্ধে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। অভিযোগ পাওয়া মাত্রই প্রয়োজন হলে অভিযান আরো জোরদার করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *