সোহেল হোসেন লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি:
স্বামীর মৃত্যুর খবরে আলীর স্ত্রী সাফিয়া বেগমের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে। তিনি দুই দিন ধরে থেমে থেমে কান্নায়-বিলাপে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তিনি। বড় মেয়ে সুফিয়া আক্তারের চোখেও জল। কখনো ডুকরে কাঁদছেন, কখনো মূর্ছা যাচ্ছেন। যেন তাকে (মেয়ে) ঘিরে বাবার স্বপ্ন দেখার কথা বারবার সামনে আসছে। কে, কী বলে তাদের সান্ত্বনা দেবেন, ভাষা জানা নেই স্বজনসহ প্রতিবেশীদের। কারণ, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আলী আহমেদ সৌদি আরবে গিয়ে মারা যান।

আলী আহমেদের (৪২) বাড়ি লক্ষ্মীপুরের সদর উপজেলার চররুহিতা ইউনিয়নের রসুলগঞ্জ গ্রামে। তিনি মৃত আনোয়ার উল্যার ছেলে। তার রয়েছে তিন শিশুসন্তান। তাদের মধ্যে ১৫ মাস বয়সী মেয়েটি শারীরিক প্রতিবন্ধী।
খবর পেয়ে শনিবার (১৭ জুলাই) দুপুরে চররুহিতা ইউনিয়নের রসুলগঞ্জ বাজার এলাকার কালাগাজী বাড়িতে যান এই প্রতিবেদক। এ সময় দেখা যায় বাড়িতে চলছে গগনবিদারি চিৎকার আর বিলাপ। ছেলের মরদেহ তার কোলে ফিরিয়ে দিতে সবার কাছে আকুতি করছেন আলী আহমেদের বৃদ্ধা মা আফিয়া খাতুন।
কর্মস্থলে তার (আলী) খাবার ও পানির চরম সংকট ছিল। তাকে সারা দিনে খেতে দুটি রুটি দেওয়া হতো। বিষয়টি আলীকে ভিসা দিয়ে নেওয়া মুরাদকে জানানোর পরও কোনো উদ্যোগ নেননি। খাওয়ার কষ্টে তিনি মারা গেছেন বলে দাবি পরিবারের।

তিনি বিলাপ করে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আমার বাবারে যদি হারো (পার), আঁর (আমার) বুকে আনি দাও, আমি একটু চাইয়াম, আমার বাবারে…। আঁর বাবার লাশ হলেও আনি দে, বাবার লাশ চাইয়াম। মাইনসে বিদেশ যায় কামাই করতে, আঁর বাবা বিদেশ যায় মৃত্যু কামাইছে। ও আল্লাহ, আঁর মরি যাইতে মন চাইরে’।

গত ১৫ জুলাই রাতে আলী আহমেদের মৃত্যুর বিষয়টি সৌদি আরব থেকে মুরাদ হোসেন নামের একজন ফোনে আলীর পরিবারকে জানিয়েছেন। মুরাদের মাধ্যমেই ভিসা নিয়ে আলী সৌদি আরবে পাড়ি দিয়েছেন। মুরাদ রসুলগঞ্জ বাজারের ফল ব্যবসায়ী আবু তাহেরের শ্যালক।

পারিবারিক সূত্র জানায়, সংসারের অভাব ঘোচাতে ৪ লাখ টাকা ধার করে প্রায় তিন মাস আগে আলী আহমেদ সৌদি আরবে যান। সেখানে তিনি ছাগল পালনবিষয়ক কাজ করার কথা। পরে তিনি আল হাবিব এলাকায় কাজে যোগ দেন। যাওয়ার দুই মাস পর্যন্ত স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গে তার কথা হয়। সবশেষে এক মাস দুই দিন আগে স্ত্রীর সঙ্গে তার কথা হয়। তখন দেশে জীবিত অবস্থায় ফিরতে পারবেন কি না, এমন শঙ্কা জানিয়ে স্ত্রীর কাছে ক্ষমা চান। কারও কাছ থেকে টাকা ধার করে ছেলে-মেয়েদের জন্য খাবার ও চিকিৎসা করানোর পরামর্শ দেন স্ত্রীকে। এরপর থেকেই আর আলীর কথা হয়নি পরিবারের সঙ্গে।
তারা জানান, কর্মস্থলে তার (আলী) খাবার ও পানির চরম সংকট ছিল। তাকে সারা দিনে খেতে দুটি রুটি দেওয়া হতো। বিষয়টি আলীকে ভিসা দিয়ে নেওয়া মুরাদকে জানানোর পরও কোনো উদ্যোগ নেননি। খাওয়ার কষ্টে তিনি মারা গেছেন বলে দাবি পরিবারের।

আলীর স্ত্রী সাফিয়া বেগম জানান, তার স্বামীকে ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না। এক মাস আগে তার সঙ্গে কথা হয়। এরপর আর কথা হয়নি। হয়তো তখনই তিনি মারা গেছেন। বিষয়টি আবু তাহের ও তার শ্যালক মুরাদ আড়াল করেছেন। এখন তার মরদেহ কোথায় আছে, তা-ও নিশ্চিতভাবে বলছে না। মরদেহটি দেশে আনতে তিনি সরকারের হস্তক্ষেপ চান।
এ ব্যাপারে সৌদি থেকে মুঠোফোনে মুরাদ হোসেন দাবি করেন, ছাগল পালন করতে গিয়ে মাওথিয়া ভাইরাসে আলী আক্রান্ত হন। এতে ২০ দিন তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। এ জন্য পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে পারেননি। ৮ জুলাই তিনি তার কর্মস্থল আল হাবীব থেকে আল কাছিমে পালিয়ে যান। সেখানে আলী গত বৃহস্পতিবার মারা যান। পরে স্থানীয় পুলিশ তার মালিককে বিষয়টি জানিয়েছে। খবর পেয়ে আমি দেশে তার পরিবারকে জানিয়েছি। মরদেহ দেশে পাঠাতে পরিবার থেকে স্থানীয় কাগজপত্র তৈরি করে পাঠাতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ মাসুম বলেন, ঘটনাটি কেউ জানায়নি। নোয়াখালী প্রবাসী কল্যাণ ব্যুরো বিষয়গুলো দেখভাল করে। কোনো সহযোগিতা প্রয়োজন হলে আমরা করব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *