এস ইসলাম, নাটোর জেলা প্রতিনিধি:

লালপুরে বিলমাড়ীয়া পদ্মানদীর জেগে ওঠা চর এখন সবুজে সবুজে ভরে উঠেছে , দেখে বোঝার উপায় নেই এক সময় এ দিক দিয়ে প্রবাহিত হতো পানি , শন শন শব্দে পানির স্রোতের গর্জন এর কথা মানুষ ভুলতে বসেছে। হাজার হাজার বিঘা জমিতে শোভা পাচ্ছে রাশিরাশি সবুজের সমারোহ , ভরে উঠেছে ফুলে ফলে , কৃষকের মনে হাসি ফুটেছে। এক সময়ে সর্বনাশা পদ্মা নদী ভাঙ্গনে নি:স্ব হওয়া কৃষক পরিবার সুখের স্বপ্ন দেখছে । তাদের উৎপাদিত সবজি এখন দেশের বিভিন্ন স্থানে রপ্তানি করা হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায় সত্তরের দশকে লালপুর উপজেলার বিলমাড়ীয়া-লালপুর ও ঈশ্বরদী ইউনিয়ন এর ১৮ টি গ্রাম সর্বনাশা পদ্মা নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এতে কয়েক হাজার পরিবার নি:স্ব হয়ে রাস্তায় বসে। আশির দশকেই জেগে ওঠা শুরু হয় চর। বাদামের আবাদ দিয়ে শুরু হয় নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন , আজ স্বপ্ন সত্যিকারেই সুখের আলো দেখাচ্ছে।

নতুনভাবে শুরু হয়েছে বসতি বিদ্যুতের আলোয় হচ্ছে আলোকিত এখন দেখে বোঝার উপায় নেই এদিক দিয়েই পদ্মা নদী প্রবাহিত হয়েছে।

চরের বুকে কাজ করতে গিয়ে ক্লান্ত শরীর বট বৃক্ষের নিচে বসে শীতল হাওয়ায় জড়িয়ে নিচ্ছে , শীত মৌসুমে খেজুরের রস থেকে উৎপাদিত হচ্ছে গুড় , বাঁশ বাগানের মাথার উপর দিয়ে মায়েরা কোলের বাচ্চা কে এখন চাঁদ দেখাচ্ছে , সত্যি কারের অপরূপ সাজে সেজেছে পদ্মার চর।

দিয়ার শংকরপুর , নওসারা সুলতানপুর , আরাজি বকনা , সেকেন্দারপুর ,চাকলা বিনোদপুর , রসুলপুর , মোহরকয়া আংশিক , সহ সকল চরেই আবাদ হচ্ছে মুলা, কুমড়া, গাজর, টমেটো, ফুল কপি, পুঁই শাক, লাল শাক, ধেড়স , ঝিঙে, করোলা, পটল, বেগুন, কলা,সহ নানা সবজি। চাষ করা হচ্ছে আখ , বাদাম ,ধান ,গম ,সরিষা, মটর , মশুর ,পাট নানা ফসল। নতুন ভাবে শুরু হয়েছে পান চাষ। এছাড়াও গড়ে উঠেছে আম পেয়ারা মাল্টা ও বড়ই বাগান । বিলমাড়ীয়া ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ সেলিম জানান প্রায় ১শ বিঘা জমিতে মাল্টা বাগান গড়ে উঠেছে যা নাটোর জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এখন চলছে এ চরে কুমড়ার মৌসুম । মোহরকয়া ভাঙ্গাপাড়া গ্রামের কৃষক জিল্লুর রহমান জানান , এবারে প্রায় ৪শ কৃষক কুমড়া চাষ করেছে। ফাল্গুন-চৈত্র কুমড়ার চারা রোপণ করা হয় , বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি থেকে কুমড়া উত্তোলন শুরু হয় ।প্রতি বিঘা জমিতে কুমড়া চাষে খরচ হয় ২০ হাজার টাকা প্রায় , কুমড়া বিক্রি হয় ৪০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা । কিন্তু এতো কিছুর পরও সবকিছু ফিকে হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে। তিনি আরো জানান , চরে উৎপাদিত ফসল পরিবহনের জন্য রাস্তা জরুরী , রাস্তা ভাল না উৎপাদিত ফসল পরিবহনে বেশি খরচ হয় । ১টি কুমড়া মাথায় করে বাজারে আনতে ৩ – ৪ টাকা , পরিবহনে আনলে ২ টাকার লাগবে। চরের জমি এখন আমাদের জন্য আশীর্বাদ হয়েছে কিন্তু সরকারি কোন সহযোগিতা আমরা পাইনি, জমির খাজনা চালু না থাকায় কৃষকের ভাগ্যে জোটে না কৃষি ঋণ । সরকার বিভিন্ন সময় কৃষকদের প্রণোদনা দিলেও প্রকৃত কৃষকরা সঠিক ভাবে পাইনা।

কৃষকদের অভিযোগ রয়েছে , কৃষি কর্মকর্তারা খোঁজ খবর নেন না , তাই তারা সঠিক সময়ে পরামর্শ না পাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। বিলমাড়ীয়া ইউনিয়নে দায়িত্ব পালনকারী উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ সেলিম জানান , গতবারের চেয়ে কুমড়া চাষ কমেছে , বেড়েছে পটল ও মাল্টা । তাদের বিরুদ্ধে কৃষকদের খোঁজ খবর না নেয়ার অভিযোগ টি সঠিক না বলে জানান।

বিলমাড়ীয়া বাজারে প্রতিদিন সকাল ৫ টা থেকে কুমড়ার হাট বসে । বিলমাড়ীয়া , পানসীপাড়া , নওপাড়া , শহীদ আকবর আলী সড়ক ( কয়লার ডহর ) এলাকা থেকে বাস-ট্রাক , ইঞ্জিন চালিত ভ্যান , সাইকেলে করে চরের উৎপাদিত বিভিন্ন সবজি সহ বড়ই , পেয়ারা , কলা রাজধানী ঢাকা , চট্টগ্রাম , কুমিল্লা , নারায়ণগঞ্জ , সিলেট , খুলনা , বরিশাল অঞ্চল ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় নিয়ে যায় । লালপুর কলোনি , বিলমাড়ীয়া মোল্লার ঘাট ও বাজার ঘাটে ব্রিজ নির্মাণ সহ রাস্তা ঘাটের উন্নয়ন করা হলে হলে কৃষকদের উপকার যেমনি ভাবে হবে , তেমনি এলাকার উন্নয়নে এক ধাপ এগিয়ে যাবে বলে মনে করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *